ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন হওয়া উচিত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক! - বিডি নিউ

ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন হওয়া উচিত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক!

0
Loading...

বৈবাহিক সম্পর্ক স্থিতিশীল ও ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের বিশ্বস্ততা, সহযোগিতা, সহানুভূতি, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ইজ্জত-সম্মান এবং প্রেম-ভালোবাসার মুখাপেক্ষী। রাসুল (সা.)-এর বৈবাহিক জীবনে এসবের ছাপ গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। রাসুল (সা.)-এর আচার-আচরণ, চাল-চলন নিজের জীবন সঙ্গিনীর সঙ্গে সহানুভূতি ও স্নেহময় ছিল।

মানব সমাজে যদি একটি প্রশ্ন করা হয়, সর্বোত্তম আদর্শ পুরুষ কে? স্বাভাবিক উত্তরে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী একেকজনকে সর্বোত্তম আদর্শবান মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করবে। যেমন উলামায়ে কেরামের দৃষ্টি ওই ব্যক্তির ওপর নিবদ্ধ হবে যে ইলম, মারেফত ও হিকমতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। আর বস্তুবাদীরা ওই ব্যক্তিকেই মনে করবে যে ধন-সম্পদের দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে দূর-বহুদূর অগ্রসর হয়ে গেছে এবং সবার দৃষ্টিতে যে ঈর্ষার পাত্র। ব্যাংক-ব্যালেন্স এবং অর্থ-সম্পদে যার কোনো জুড়ি নেই। অন্যদিকে যারা খ্যাতির পাগল, তারা এমন ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত মনে করবে, যার ড্রয়িংরুম রকমারি বাহারি পুরস্কারে সজ্জিত। যার নাম-খ্যাতি শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, ধনী-গরিব, জ্ঞানী, মূর্খ নির্বিশেষে সবার মুখে মুখে। আবার অনেকের দৃষ্টিতে এর অধিকারী সুশীল সমাজের কেউও হতে পারে, যারা (নিজেদের ভাষায়) নিজেদের জন্য নয়, বরং অন্যের জন্য বেঁচে থাকে।

Loading...

দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব মতামতের প্রতিটিই সংকীর্ণতা এবং সীমাবদ্ধতার শিকার। মানব জীবনের শুধু বিশেষ একটি দিকের বিবেচনায় তারা এমন হতে পারে! কিন্তু উত্তম ব্যক্তি হিসেবে ধারণাকৃত এসব ব্যক্তিবর্গ জীবনের সর্ববৃহৎ ক্ষেত্রে সর্বনিকৃষ্ট হিসেবেও প্রমাণিত হতে পারেন! তাই এই প্রশ্নের সুন্দর ও সর্বব্যাপী উত্তর তো সেটাই, যা রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর দৃষ্টিতে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে আচার-ব্যবহারে সর্বোত্তম। ইরশাদ করেন, অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। আর স্ত্রীদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারে আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (তিরমিজি-৪০৬২)

বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটা আশ্চর্য মনে হতে পারে, এর দ্বারা বৈবাহিক জীবনকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে অনুমেয় হবে, উত্তম ব্যক্তি নির্বাচনে সহধর্মিণীর সঙ্গে সদাচারের চেয়ে নির্ভেজাল উত্তম কোনো কষ্টিপাথর হতে পারে না। এর দ্বারা পরখ করলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অতি সহজ হবে যে, বাস্তবিকই সে উত্তম ব্যক্তি নাকি শুধু ভদ্রতার তকমা লাগিয়ে লোকসমাজে ঘুরে বেড়ায়। কারণ মানুষকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে যেমন মনে হয়, বাস্তবে সে তেমন হয় না। বরং বাহ্যিক দিক তো কখনো কখনো এমন প্রতারণাময় হয় যে, বড় বড় দার্শনিক এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও ধোঁকায় নিপতিত হয়।
দেখুন, অনেক ব্যক্তি দ্বীনদারীর লেবাস এমন পরিপাটির সঙ্গে পরিধান করে এবং তাকওয়া ও পবিত্রতার কৃত্রিম ক্রিম দ্বারা নিজেকে এমন আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে যে, মানুষ তার ভদ্রতা ও দ্বীনদারীর কসম করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু যদি সামগ্রিকভাবে তার পারিবারিক জীবনের নিরীক্ষণ করা হয়, তাহলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। দেখা যাবে, ভদ্রতা, দ্বীনদারী সব ঘরের বাইরে। ঘরে সে অত্যন্ত বদ-তমিজ, স্বার্থপর ও পাষাণ। বাইরে ভদ্রতা দ্বীনদারীর ডঙ্কা বাজালেও ঘরে সে হিংস্র এবং নিত্যনতুন বর্বর নির্যাতনের আবিষ্কারক। তার মধ্যে না শরিয়তের বিধি-বিধান ও শিক্ষা-দীক্ষার পরোয়া আছে, আর না আছে রাসুল (সা.)-এর আদর্শের দ্বারা ঘরকে আলোকিত করে জান্নাতের বাগান বানানোর চিন্তা-চেতনা। যেখানে থাকবে না কোনো ঝগড়াঝাটি, থাকবে শুধু প্রশান্তি। যেখানে স্থান হবে না অশুভ অমঙ্গল কোনো কিছুর, স্থান হবে শুধু শুভ ও কল্যাণকর সব কিছুর। যেখানে থাকবে প্রফুল্লতা, থাকবে না সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা। বিতৃষ্ণা ঘৃণা থাকবে না, থাকবে প্রেম-ভালোবাসা।

দেখুন, স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার এমন একটি আয়না, যার মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির আসল রূপ ফুটে ওঠে। কারণ মানুষের স্বভাব হলো, দুর্বলের সামনে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা। শারীরিকভাবে নারীরা স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে তারা সাধারণত দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে। এ ছাড়া বিবাহের পর আত্মীয়স্বজন, আপনজন এবং সাহায্য-সহযোগিতাকারী থেকে থাকে দূর বহু দূরে। ফলে সে স্বামী ও তার পরিবার-পরিজনের রহম-করম নির্ভর হয়ে থাকে। এ কারণেই স্বামী (অনেক ক্ষেত্রে তার পরিবারের লোকজন) অতি সাধারণ কারণে ও তার সঙ্গে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে। সাধারণত স্বামী (ও তার পরিবারের লোকজন) তাকে পরিবারের একজন পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতিও দিতে চায় না। মনে করে তাদের রহম-করমের ছায়ায় লালিত-পালিতের মর্যাদাই বা কতটুকু। এ কারণেই স্বামী (বা তার পরিবার) তার সঙ্গে অসম্মানজনক আচার-আচরণ করতে কোনো প্রকার দ্বিধা করে না। অসংলগ্ন ভাষার ব্যবহার তো অতি সাধারণ ব্যাপার। অনেক পরিবারে তো গালাগাল ও মারধর করার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এ ক্ষেত্রে মূর্খ ও শিক্ষিতের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই বললেই চলে। শিক্ষিতরা তো নিজেদের কুকর্মকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন যুক্তির আশ্রয় নিতেও ভুল করে না। যেমন বলে থাকে, স্বামীর মর্যাদা রূপকার্থে খোদার সমপর্যায়ের! ইসলাম ধর্মে যদি আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা বৈধ হতো, তাহলে স্ত্রীদের বলা হতো তারা যেন স্বামীদের সিজদা করে। আরো কত যুক্তি-দলিল পেশ করে থাকে! কিন্তু যখন স্ত্রীদের অধিকারের কথা ওঠে, তখন এ কথা বলে জান বাঁচানোর চেষ্টা করে যে এ ধরনের অসংখ্য অধিকার চৌদ্দ শ বছর আগেই ইসলাম নারীদের প্রদান করেছে। হ্যাঁ ভাই! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইসলাম নারীদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যে পরিমাণ ইজ্জত-সম্মান ও ব্যাপক অধিকার দান করেছে, নারীবাদের ধ্বজাধারী পশ্চিমারা দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবে না ইনশা আল্লাহ। তবে প্রশ্ন হলো, ইসলামের প্রদত্ত অধিকার মুসলিম নারীরা পারিবারিক জীবনে কী পেয়েছে? নিঃসন্দেহে উত্তর ‘না’ সূচক হবে! এর ব্যতিক্রম দু-চারজন থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে মুসলিম নারীদের অবস্থা পারিবারিক জীবনে অমুসলিম নারীদের থেকে ভিন্ন নয়। তারাও তাদের মতো পারিবারিক বৈষম্যতার শিকার, নির্যাতিতা হওয়াই তাদের ভাগ্যের লিখন। কপালিরাই এর ব্যতিক্রম হয়।

রাসুল (সা.) উত্তম ব্যক্তি হওয়ার যে কষ্টিপাথর নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এর আলোকে যদি তাঁর পবিত্র জীবনকে পরখ করে দেখা হয়, তাহলে অনুমান করা সহজ হয়ে যাবে যে রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে মানবজাতির জন্য আদর্শ ও নমুনা। অতএব, অধিকার প্রদানের কথা স্বীকার নয়, বরং একজন মুসলমান স্বীয় জীবনে এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজের পারিবারিক জীবনকে আদর্শনীয় ও সুশোভিত করাই হবে বিচক্ষণতা ও ধার্মিকতার পরিচায়ক। বৈবাহিক সম্পর্ক রহমত ও ভালোবাসার বৃক্ষ : বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসা ও রহমতের এমন বৃক্ষ রোপণ করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি সঠিকভাবে এই বৃক্ষের পরিচর্যা করবে, সে শুধু যে এর ফল ভোগ করবে, তা নয়। বরং এর সুশীতল ছায়ার নিচ দিয়ে অতি সহজে পার্থিব জীবনের দীর্ঘ সফর শেষ করতে পারবে। আর যে ব্যক্তি এর মূল্যায়ন করবে না, সে এর উপকার ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে।

বৈবাহিক সম্পর্ক স্থিতিশীল ও ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের বিশ্বস্ততা, সহযোগিতা, সহানুভূতি, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ইজ্জত-সম্মান এবং প্রেম-ভালোবাসার মুখাপেক্ষী। রাসুল (সা.)-এর বৈবাহিক জীবনে এসবের ছাপ গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। রাসুল (সা.)-এর আচার-আচরণ, চাল-চলন নিজের জীবন সঙ্গিনীর সঙ্গে সহানুভূতি ও স্নেহময় ছিল। হুজুর (সা.) তাঁদের প্রফুল্ল করতে এবং সম্মান করার মধ্যে কোনো ত্রুটি বা কমতি করেননি। এ ব্যাপারে ছোট ছোট বিষয়েও তিনি খেয়াল রাখতেন।

নিম্নে কয়েকটি ঘটনা প্রদত্ত হলো- সান্ত্বনা প্রদান : বর্ণিত আছে, হজরত ছাফিয়্যাহ (রা.) কোনো এক সফরে হুজুর (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। তিনি যে উটে আরোহণ করেছিলেন, তা অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় কাঁদতে শুরু করেন। এ অবস্থা দেখে রাসুল (সা.) তাঁর কাছে এসে নিজ হাতে তার চোখের পানি মুছে দেন এবং তাঁকে সান্ত্বনা দেন। (আসসুনানুল কুবরা-নাসাঈ হা. ৯১১৭)

স্ত্রীর প্রশংসা : রাসুল (সা.) স্ত্রীদের প্রশংসা করার মধ্যেও কোনো কমতি করতেন না। বরং ভরপুর মজলিসে প্রশংসা করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। যেমন একবার ইরশাদ করেন, খাদিজার প্রতি আমার প্রচণ্ড ভালোবাসা রয়েছে।” (মুসলিম হা. ২৪৩৫) আরেকবার হজরত আয়েশা (রা.)-এর ব্যাপারে বলেন, ‘খাদ্যের মধ্যে যেমন ‘ছরীদ’ (আরবের খাবার বিশেষ) সর্বশ্রেষ্ঠ, তেমনি নারীদের মধ্যে আয়েশা শ্রেষ্ঠ।’ (বোখারি, হা.-৩৪১১)

এক পাত্রে পান করা : বর্ণিত আছে, হজরত আয়েশা (রা.) পেয়ালার যেখানে মুখ রেখে পান করতেন, রাসুল (সা.) সেখানে মুখ রেখে পান করতেন এবং একই হাড্ডির গোস্ত আয়েশা (রা.) খেয়ে রাসুল (সা.)-এর হাতে দিলে রাসুল (সা.) সেখান থেকেই খেতেন, যেখান থেকে আয়েশা (রা.) খেয়েছেন। (নাসাঈ, হা. ৭০)

একসঙ্গে গোসল করা : বর্ণিত আছে, ‘রাসুল (সা.) এবং হজরত মাইমুনা (রা.) একই সঙ্গে একই মগ দিয়ে একই পাত্রের পানি দিয়ে গোসল করেন। (নাসাঈ, হা. ২৪০)

Loading...

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন!
[X]
Loading...